Sunday, September 13, 2015

ফাইনালেও দরকারে সেই ‘চোরা আক্রমণ’

কোর্টে তিনি অনায়াস দক্ষতার মূর্ত ব্যক্তিরূপ। যা কঠিন, তাকে সহজ করে দেখানো তাঁর সহজাত প্রতিভার অন্যতম। ঐশ্বরিক ফোরহ্যান্ড হোক বা ক্রসকোর্ট ব্যাকহ্যান্ড— মসৃণ টেনিস দেখলে মনে হবে তিনি অক্লান্ত, সদা শান্ত।
আর ইনি শুধু কোর্টের রজার ফেডেরার নন, কোর্টের বাইরেরও।
স্ট্যানিসলাস ওয়ারিঙ্কাকে ৬-৪, ৬-৩, ৬-১ হারিয়ে ওঠার পরে প্রশ্নটা তাঁকে শুনতে হতই। শুক্রবার রাতের পর সেরেনা উইলিয়ামসের কক্ষচ্যূত হওয়া যদি এ বার যুক্তরাষ্ট্র ওপেনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়, তা হলে তার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত সেটা ছিলেন রজার ফেডেরার। আরও ভাল করে বললে, রজার ফেডেরারের নতুন শট।
এস-এ-বি-আর। স্নিক অ্যাটাক বাই রজার। বিপক্ষের সেকেন্ড সার্ভে দৌড়ে এসে হাফ-ভলিতে বল রিটার্ন করা। বিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করে দেওয়া। গতির অভাবে ডিপ বলে পাসিং শট খেলতে তাদের বাধ্য করা। যে শটের অসামান্য প্রয়োগে ২০০৯-এর পরে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র ওপেন ফাইনালে ফেডেরার। এবং যে শট নিয়ে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে টেনিসবিশ্ব।
বরিস বেকার, যাঁর শিষ্য নোভাক জকোভিচের সামনে রবিবার খেতাবি লড়াইয়ে নামছেন ফেডেরার, তাঁকে ‘অ্যান্টি এসএবিআর’ ক্লাবের চেয়ারম্যান বললে খুব ভুল হবে না। গত বারের চ্যাম্পিয়ন মারিন চিলিচকে ৬-০, ৬-১, ৬-২ হারিয়ে জকোভিচ ফাইনালে ওঠার আগেই বেকার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বলে দেন, ফেডেরারের এই শট বিপক্ষের প্রতি অসম্মানজনক। তাঁর প্রজন্ম নাকি এ সব কাণ্ড মোটেই চুপ করে মেনে নিত না। জন ম্যাকেনরো, জিমি কোনর্স, ইভান লেন্ডল বা তাঁর নিজের সামনে পড়লে নাকি ফেডেরারকে রেয়াত করতেন না কেউ।
যা শুনে ফেডেরারের উত্তর তাঁর টেনিসের মতোই অনায়াস, মসৃণ— ওহ, না। ওটা অসম্মানজনক শট নয়। ব্যাপারটা তো খুব সহজ!
সমালোচনার নতুন আগ্নেয়গিরির সামনে ফেডেরার মোটেই বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ নন। কিছুটা অবাক, এটুকুই যা। তাঁর মনে পড়ে যাচ্ছে, কেরিয়ারের শুরুর দিকে তাঁকেও এ রকম স্ট্র্যাটেজি সামলাতে হয়েছিল। ম্যাক্স মির্নি, টিম হেনম্যানরা তাঁকে সার্ভ করার আগে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, যতক্ষণ না নিজেরা ঠিকঠাক পজিশন নিতে পারছেন। ‘‘স্প্যানিশরাও কম যায়নি। ক্লে কোর্টে ডাবলস অ্যালির সামনে ওরা ফোরহ্যান্ড হিট করতে দাঁড়িয়ে থাকত। কারণ তখনও আমার সেকেন্ড সার্ভটা অত ভাল ছিল না। তাই আমাকেও এ সব কম সামলাতে হয়নি,’’ বলছেন ফেডেরার।
এই স্ট্র্যাটেজি বিপক্ষকে কী ভাবে ভয় দেখাতে পারে, তা-ও বোধগম্য হচ্ছে না ফেডেরারের। তিনি স্বাভাবিক পজিশনে দাঁড়িয়ে সার্ভের অপেক্ষা করছেন। বিপক্ষ বল না ছোড়া পর্যন্ত নড়ছেনও না। তা হলে ভয় দেখানোটা হচ্ছে কখন? ‘‘প্লেয়াররা এটা নিয়ে আমাকে কিছুই বলেনি। যা শুনছি, সব মিডিয়ার কাছ থেকে। আর হ্যাঁ, ফাইনালে যদি মনে হয় শটটা খেললে সুবিধে হবে, আমি সেটাই করব। সিনসিনাটির টাইব্রেকে চাপের মুখে জকোভিচের বিরুদ্ধে ওটা কাজে দিয়েছিল,’’ বলছেন ফেডেরার।
গত মাসের সেই ফাইনালে হারের পরে জকোভিচ বা তাঁর কোচ যে ফেডেরারকে ক্ষমা করেননি, নিশ্চিত টেনিসবিশ্ব। তবে বেকার-ব্রিগেড যা-ই বলুক, রজারের সমর্থনে অনেকেই সরব। তাঁর স্বদেশী ওয়ারিঙ্কা নিজেই যেমন শটটা খেলেছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যান্ডি মারে বধের নায়ক কেভিন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে।
চৌত্রিশেও সমান ক্ষিপ্র।
টেনিস বিশেষজ্ঞদের একটা মহলে আবার পাল্টা তর্ক, বেকার কী ভাবে অন্য কারও গেমসম্যানশিপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন? তিনি নিজেই তো অনেক ম্যাচে ইচ্ছে করে সময় নষ্ট করেছেন। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, এটা কি আদৌ অখেলোয়াড়োচিত আচরণ? না কি নিয়মের এক্তিয়ারে থেকেই একজন প্লেয়ারের নিজেকে আরও উন্নত করে তোলার চেষ্টা? তাঁদের যুক্তি, এই শটটা মোটেও সহজ নয়। এতে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। অনেকে রসিকতা করছেন যে, এ বার তা হলে এই শট নিয়ে ফেডেরারের বিরুদ্ধে পিটিশন দায়ের করা হোক। তা হলে ইভো কার্লোভিচকে বলা হোক, অত জোরে সার্ভ না করতে। তা হলে রাফায়েল নাদালকে বলা হোক তাঁর টপস্পিনটা বাদ দিতে।
এই মহল ফেডেরারের নতুন শটে অসম্মান খুঁজে পাচ্ছে না। বরং এটাকে দেখছে কেভিন পিটারসেনের সুইচ-হিটের টেনিস সংস্করণ হিসেবে। যার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়, ঝুঁকি নিয়ে দারুণ কিছু করে দেখানো। বলা হচ্ছে এটা ট্রেভর চ্যাপেলের আন্ডারআর্ম বোলিং নয় যে, ক্রীড়া-কুখ্যাতদের তালিকায় রাখতে হবে। বরং এটাকে দেখা উচিত টেনিস স্পিরিটের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। মোকাবিলা করতে পারলে করো, না হলে মুখ বন্ধ রাখো!

No comments:

Post a Comment