রবি শাস্ত্রীকে আগামী বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত বোর্ডের রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তটা শুনলাম। ভারতীয় টিম ডিরেক্টরকে একটা কথা আমার খুব বলতে ইচ্ছে করছে।
রবি, রবিবার থেকে তোমার কিন্তু কঠিন সময় শুরু হয়ে গেল!
কেউ কেউ বলবেন, ভালই তো হল। টিম ইন্ডিয়ার কোচ নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশাটা এত দিন ছিল, বলা হচ্ছিল অমুক সফর পর্যন্ত শাস্ত্রী, তার পর কোচ বাছা হবে, এ সব তো আর থাকল না। টিমটা জেনে গেল, আগামী মার্চ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন বাদে তাদের উপরের লোকটা কে। সাপোর্ট স্টাফেও সঞ্জয় বাঙ্গার-ভরত অরুণরা থেকে গেলেন। এটা একটা ভাবনা। কিন্তু আমি ব্যাপারটাকে একটু অন্য ভাবে দেখব। একটু অন্য ভাবে বিচার করব।
সোজাসুজি বললে, রবির হাতে এখন দু’টো টিম, দু’জন আলাদা অধিনায়ক, যাদের অধিনায়কত্বের স্টাইল আলাদা। শুধু দু’জন ক্যাপ্টেন বা তাদের স্টাইল ম্যানেজ করা নয়, টিমের বাকি দশ জনের মাইন্ডসেটও ওর এখন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যা খুব সহজ কাজ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, ও বেশি সময় পাবে না। কখনও কখনও দেখা যাবে, এক মাসের মধ্যে দু’টো ভারতীয় টিম নামছে দু’জন আলাদা অধিনায়ক নিয়ে। যাদের অধিনায়কত্বের স্টাইলের মধ্যের সেতু হতে হবে রবিকে। সঙ্গে দেখতে হবে যাতে বাকি প্লেয়ারদের দু’জন অধিনায়কের স্টাইলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধে না হয়।
একটু খুলে বলি। অক্টোবর মাস থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শুরু হয়ে যাচ্ছে। অক্টোবর থেকে নভেম্বরের একটা সময় পর্যন্ত ভারতীয় টিমের ক্যাপ্টেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। কারণ ওই সময়টায় টি-টোয়েন্টি আর ওয়ান ডে চলবে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। আবার নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত টেস্ট চলবে, আর অধিনায়ক তখন কোহলি। মানে, দু’মাসের মধ্যে দুই অধিনায়কের নেতৃত্বে নামতে হবে টিমকে। আর কোহলি এবং ধোনির অধিনায়কত্বের সব কিছুতে তো আর মিল নেই। কোহলির চেয়ে ধোনি কম আগ্রাসী নয়, কিন্তু ওর আগ্রাসনের প্রকাশটা নেই। টেস্টে ইশান্ত শর্মারা ক্যাপ্টেনের থেকে প্রবল আগ্রাসনের লাইসেন্স পেয়ে বিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে গালিগালাজ করতে পারে। কিন্তু ওয়ান ডে-তে ধোনি সে সব পছন্দ না-ও করতে পারে। বলতে চাইছি, যে মানসিকতা নিয়ে টেস্টে বিরাটের টিম নামছে, একই মানসিকতা নিয়ে ওয়ান ডে বা টি-টোয়েন্টিতে ধোনিও নামবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আর এখানেই কাজ শুরু হবে রবির। ওকে দেখতে হবে দুই অধিনায়কের স্টাইলের মধ্যে যেন সংঘাত না হয়। আবার এটাও দেখতে হবে, প্লেয়ারদের এত কম সময়ের মধ্যে দুই অধিনায়কের স্টাইল ধরতে অসুবিধে না হয়। বাকি দশ জন যেন ধোঁয়াশায় না ভোগে যে, ধোনি না কোহলি, কার কথা শুনব? কার স্টাইল মেনে চলব?
আরও আছে। আশা করছি, ধোনি আর কোহলির মধ্যে কোনও রকম ইগো সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি হয়, সেটা খুব অস্বাভাবিক ঘটনা হবে না। বিরাট জানে, আগামী দিনে ভারতীয় টিমের রিমোট কন্ট্রোল ওর হাতে থাকবে। আবার ধোনি এত দিনের প্রতিষ্ঠিত অধিনায়ক। ওর শান্ত আগ্রাসন, লোহার রডের মতো পোক্ত থেকে চাপ সামলানোর ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি— কোনও কিছু নিয়ে প্রশ্ন চলে না। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই সেরা চরিত্রের মধ্যে যাতে বিন্দুমাত্র সমস্যা না হয়, দেখার দায় কিন্তু রবিরই। সংসারের অভিভাবকের মতো সেটা সামলাতে হবে।
আমি দাদির, মানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে খেলেছি। ওর সময় দু’টো ফর্ম্যাটে দু’জন অধিনায়ক ছিল না ঠিকই, কিন্তু টিমে মহাতারকা তো কম ছিল না। সচিন, রাহুল, কুম্বলে— কে নেই? দাদিকে দেখতাম, দুর্দান্ত ব্যালান্স রেখে চলত। ম্যান ম্যানেজমেন্টটা অসম্ভব ভাল বুঝত। রবিকেও সেটা বুঝতে হবে, করতে হবে। কারণ, দাদির সময় থেকেও মিডিয়া এখন অনেক বেশি তুখোড়। ড্রেসিংরুমে উনিশ থেকে বিশ হলে কিন্তু পরের দিন ওটা প্রথম পাতার খবর!
শেষে আর একটা ব্যাপার বলি। ওটাও রবির দায়িত্বের মধ্যে পড়বে। হালফিলে দেখছি রবি আর বিরাটের অতি আগ্রাসন নিয়ে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। কারও পছন্দ হচ্ছে। কারও হচ্ছে না। এটা বুঝি যে টেস্টে ভারতের তরুণ টিমটা নিজেদের একটা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিল। বিশ্বকে দেখাতে চাইছিল, আমরা কী ধরনের ক্রিকেট খেলতে চাইছি। ঠিক আছে। সেটা হয়ে গিয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কায় সিরিজ জিতেছে ভারত। ব্র্যান্ডটাও বোঝানো গিয়েছে। কিন্তু এ বার শান্ত ব্যাপারটাকে টেস্ট সংসারে আনা দরকার। দেখতে হবে, আগ্রাসন দেখাতে গিয়ে সেটা যেন অহেতুক আগ্রাসনে শেষ না হয়। এটাও রবিকে করতে হবে। টিমে উত্তেজনা ওকেই কমাতে হবে।
অস্ট্রেলিয়াও তো আগ্রাসন দেখায়। কিন্তু ওরা সেটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। নিজেরা কিন্তু তাতে প্রভাবিত হয় না। প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করতে এমন কিছু করে না যাতে শাস্তির কোপটা ওদের ঘাড়েও নেমে আসে।

No comments:
Post a Comment